মনের
ভেতর মন
১
শুধু আজকের
রাতটাই অপেক্ষা। এর পর থেকে হয়ত জীবনের একটা মোর পাল্টে যাবে। অনেক টুকরো চিন্তা
বার বার ধরে মনের আকাশে উঁকি দিচ্ছে। কিছু বা সুখের আবার কিছুটা দুঃখের। আর খনিকটা
আশঙ্কার। টুসির এই তিরিশ বছেরের জীবন অন্যদের থেকে কয়েকটা ক্ষেত্রে ভীষণ আলাদা,
তাঁর জীবনের একটা বিরাট শূণ্যতা বোধ আছে। কাউকে হয়ত তা বলে বোঝানো যাবে না। সাত
পাঁচ ভাবার মাঝেই মায়ের ডাকটা কানে এল টুসির। সচেতন হওয়ার পর বুঝল কখন যেন চোখ
থেকে অনেকটা মুক্ত ঝরে পড়েছে। খাবার টেবিলে বসে টুসির মনে হল আজ বাড়ির মধ্যে যেন
একটা চোরা আনন্দের শ্রোত বয়ে যাচ্ছে। মুখে কেউ কিছুই বলছে না তবে সকলের চোখে এক
আলগা খুশী খেলা করছে। ভাই অনেক দিন পর আবার আজ আগের মতই খুনসুটি করছে। মা আজ আগের
মতই আবার জোর করে বেশি খাওয়ানোর চেষ্টা করছে, বাবা টুসির ছোটবেলার স্মৃতি রোমন্থন
করছে। টুসির মনে যেন ধন্ধ লেগে যাচ্ছে, যা সে অনুভব করছে সেগুলো সবটাই বাস্তব নাকি
কল্পনা। আজ কী বাড়ির সকলে তাঁর বিষয়ে বিশেষ যন্তবান ঠিক যেমনটা ছিল বছর ছয়েক আগে।
নাকী তাঁরা চিরকালই এমন স্নেহ প্রবণ আচরণটাই করতেন! টুসির নিজের জগৎ তাকে এই স্নেহ
উপভোগ করার ক্ষমতা থেকে দূরে করে রেখেছিল।
-কিরে টুসি কী
এত ভাবছিস বল দেখি! ডিম ভাজাটা তো ঠান্ডাই হয়ে গেল...
মায়ের কথায়
টুসি সচকিত হল। ভাই সঙ্গে সঙ্গে ট্টিপ্পনী কেটে বলল ‘মা গো তোমার টুসি আজ ডিম ভাজা খাবে
না। সোমবার তো তাই টুসু উপোস করেছে। যদি কপাল করে একটা ভালো বর জুটে যায়’। আগে হলে টুসি এই কথাটা নিয়ে ভাইয়ের সাথে প্রবল তর্ক করত। নারী স্বাধীনতা তাদের জীবনের স্বার্থকতা কেবল বিয়ের
মধ্যেই লুকিয়ে নেই এই সব নিয়ে বলত। কিন্তু আজ আর ভাই কে কিছুই বলতে ইচ্ছে করল না।
অন্যদের মত তারও ইচ্ছে করল একটু পরাধীন হতে। একটা ঘর বাঁধতে।
খাওয়া শেষ হতে
টুসি নিজের ঘরে ফিরে এল। আয়নায় নিজেকে ভালো করে একবার দেখল। নিজের মনে মনে বলল
নাহ! আমাকে এমন কিছু খারাপ দেখতে নয়। চোখের কাছের আঁচিল টার দিকে তাকাতেই অর্নবের
কণ্ঠস্বর কানে ভেষে এল “জানো টুসি এই আঁচিলটাই তোমায় সকলের থেকে আলাদা করে দেয়।” হায় রে মানুষের মন! আজ এমন দিনেও
টুসি তোর অর্ণবকে মনে পড়ল? আয়নার ভেতর থেকেই যেন আর এক টুসি বলে উঠল। আবার ফিরে এল
নিজের মনের সাথে দ্বন্দ্ব। মন বলে উঠল “মনে পড়বে না! এতটা কাল যে তার সাথে কাটিয়েছি। মানুষ
কী কখন নিজের অতীত কে ভুলতে পারে। নাকি ভোলা যায়। বারে বারে তা ফিরে আসে”।
ঝটিতে মনে পড়ে
যায় পুরনো অসম্মান। মনটা বিষাদে ভরে ওঠে। মনে হয় না যাব না। পৃথিবীর সমস্ত ছেলেরা
একই রকম। এও হয়ত আবার আমাকে এমন করে কষ্ট দেবে। দু-চোখের বাঁধ ভেঙ্গে আসে।
যন্ত্রনায় কুঁকড়ে গিয়ে টুসি আঁকরে ধরে তাঁর বালিশ টাকে। এমন করে কতক্ষন কাটল তা
জানে না। এসএমএস এর শব্দে টুসি চোখ মুছল দেখল নভনীল বার্তা পাঠিয়েছে। তার মনের কথা
লিখে আর শেষে একখানা কোটেশন জুরে দিয়েছে...
“ এখনো তারে চোখে দেখি নি...
শুধু স্বপনে
এসেছিল সে, নয়ন কোণে হেসেছিল সে।
সেই অবধি, সই,
ভয়ে ভয়ে রই- আঁখি মেলিতে ভেবে সারা হই”।
টুসি এই বার্তা
পেয়ে আনন্দে বিহ্বল হয়ে পড়ল। এর আগে তো কখনো নভনীল এমন রবিঠাকুর কে উদ্ধৃত করে
কিছু লেখে নি। সে তো পাশ্চাত্য সঙ্গীত বা কবিতা পাঠ করে আজ তবে কী হল তার? হায় রে
এত স্বপ্ন, তার জন্য কেউ এমন করে কিছু লিখে পাঠাতে পারে এতো টুসির স্বপ্নে ছিল।
কেমন করে একথা জানল নভ!
কখন যেন ঘুমিয়ে
পড়েছিল সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে টুসি ঠাহর করতে পারল না। কে যেন যত্ন করে তার গায়ে
চাদরটা দিয়ে গেছে। স্নেহের আবরণটা আর একবার ভালো করে জরিয়ে টুসি পাশ ফিরে শুতেই
মনে পড়ল আজ একটুও আলিস্যি করার মত সময় নেই। নিজেকে ঠিকমত করে সাজিয়ে নিয়ে যেতে
হবে।
বিগত এক সপ্তাহ
ধরে টুসি ঠিক করে নিয়েছিল আজ এই বিশেষ দিনটাতে সে কেমন করে সাজবে কোন জামা পড়বে...
কিন্তু আজ আকাশের রং দেখে কিছুতেই ওই জামাটা আর ভালো লাগল না। আবার বাছাই করল অন্য
একটা জামা। ইতিমধ্যে কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধু ওর দেখা করতে যাওয়ার জন্য শুভেচ্ছা বার্তা
পাঠাতে শুরু করেছে। আবার ভয়ের কালো হাতটা একটু একটু করে মনটাকে ঘিরে ধরেছে... “যদি এত আশা সব ভেঙ্গে যায়,
সমস্তটাই তো অদেখা,... এর আগে তো নভ তাকে কখনো দেখে নি। যদি নভর তাকে পছন্দ না হয়।
সামাজিক মাধ্যমগুলিতে যোগাযোগ করা এক আলাদা ব্যাপার কিন্তু সরাসরি তার যদি নভকে
পছন্দ না হয়। কী হবে?”
নাহ্ আজ
কিছুতেই এই কালো থাবাটাকে মনকে গ্রাস করতে দেওয়া যাবে না। যা হবে দেখা যাবে।
বাইরে আজ
স্বাধীনতা দিবসের উজ্জাপন উপলক্ষ্যে নানান অনুষ্ঠান চলছে। টুসির মনে হল সত্যিই কী
আমরা স্বাধীন! নিদেন পক্ষে বাক্ স্বাধীনতা টুকুই কী আমাদের আছে। যে সমস্ত বোকা
বোকা নিয়ম নীতি আমাদের পালন করতে হয় সেগুলো সম্পর্কে কী আমরা প্রতিবাদ করতে
পারি?
অনেক দিন ধরেই
ঠাকুরকে আর প্রণাম করত না টুসি। আজ হঠাৎ লোকনাথ বাবার মন্দিরটা টুসিকে যেন হাতছানি
দিয়ে ডাকল। কিন্তু কী চাইবে তা ঠিক করতে পারল না, তবুও চোখ বন্ধ করল কয়েক
মূহুর্তের জন্য তারপর না কিছুই চাইল না টুসি।
অটোয় করে ধীরে
ধীরে বেহালা থেকে টুসি পৌঁছে গেল গড়িয়া হাটের মোড়। অটো থেকে নামতেই বুকের ভিরতটা
আরো বেশি শব্দ করতে লাগল। ফোনের শব্দ কানে আসছে। মোবাইলে চোখ পড়তেই ভেসে উঠল
নভনীলের নাম।
‘কতদূর তুমি?’
-এই তো এসে
গেছি। শেষের শব্দগুলো বলার সময় টুসির গলাটা একটু কেঁপে উঠল। টুসি নিজের কাছেই লজ্জিত হল। কী ভাববে নভ।
‘আমি এসে গেছি। ঠিক মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে আছি।’ নভনীলের কন্ঠস্বর পুনরায় ভেসে এল
ফোনের ও পার থেকে।
আচ্ছা আমি
তোমাকে খুঁজে নিচ্ছি।
ফোনে কথা বলতে
বলতেই এগিয়ে গেল টুসি। দেখল হালকা আকাশি রঙ এর একটা শার্ট পরে একটি ছেলে ফোন ধরে
তার দিকে এগিয়ে আসাছে। মুখটা কি একটু চেনা? সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া ছবিটা থেকে ওর
চেহারাটা ঠিক স্পষ্ট হয় না। যাই হোক নভনীলের এসে পড়ার আগে নিজেকে সংযত করে নিল
টুসি।
হ্যালো আমি
নভনীল মিত্র।
আমি পূর্বী
ঘোষ।
প্রথমদিকে
দুজনেই কিছুটা আড়ষ্ট হয়ে ছিল। ফোনে যদিও অনেক কথাই বলা যায় কিন্তু সামনাসামনি কথা
গুলো কোথায় যেন সেঁধিয়ে বসে আছে। কিছুটা সুস্থির হওয়ার জন্য দুজনেরই মনে হল কোথাও
একটা বসা দরকার যেখানে তাদের মনের কথাগুলো বলার সুযোগ করে দেবে। স্তব্ধতা ভেঙে
নভনীলই প্রথম কথা বলল ‘তুমি কী, আমারা আজ কোথায় যাব বা কী করব সেই সংক্রান্ত কোনো পরিকল্পনা করেছো?’
পূর্বী ভাবতে
লাগল আজ কী হবে, মনটা কেমন থাকবে তাই নিয়েই সে এত ব্যস্ত ছিল যে কিছুই ভাবা সম্ভব
হয়নি। সে সংক্ষেপে উত্তর দিল ‘না’।
আচ্ছা, ঠিক আছে
আমি একটা প্ল্যান করেছি আমরা প্রথমে ট্রামে করে হাওড়া যাব, তারপর বিকেলটা আমরা
কাটাব জলে। জলে ঘুরে বেড়ানোর পর আমরা কিছু খাওয়া দাওয়া করব। কী ঠিক আছে?”
“ভালোই তো” পূর্বী সংক্ষিপ্ত জবাব দিল।
শুরু হল একটা
যাত্রা, পূর্বীর প্রথমে মনে হচ্ছিল কেমন করে সময় কাটবে, কিন্তু কি ভাবে যে দুপুর
থেকে বিকেল, বিকেল থেকে সন্ধ্যের রঙ গভীর হতে হতে আকাশ কালো হয়ে গেল তা বুঝতেও
পারল না। হাসি, গল্প, পরস্পরকে চেনা-জানা সবটাই বেশ আনন্দের মনে হচ্ছিল। ধীরে ধীরে
এল বিদায়ের সময়। নভনীল ভাবছিল এখন নিশ্চই পূর্বী তার ব্যাপারে যা সিন্ধান্ত নেওয়ার
তা নিয়ে নিয়েছে, এখন কী সে পূর্বীকে তার সিন্ধান্তের ব্যাপারে জানতে চাইবে? নাকি
বড্ড তাড়াহুড়ো হয়ে যাচ্ছে। না তার পক্ষে এমন চাপ নিয়ে বাড়ি ফেরা সম্ভব নয়। তাকে
জানতেই হবে।
‘পূর্বী আমারা তাহলে আবার দেখা করছি কবে?’ একটু ঘুরিয়ে প্রশ্নটা করেই ফেলল
নভনীল।
পূর্বী দেখল
সামনেই একটা বাস আসছে বেহালা যাওয়ার। চট করে বলল -‘আমার বাস এসে গেছে এবার যাই’।
নভনীল হতবাক
মুখে দাঁড়িয়ে রইল। বাসটা মোটামুটি ফাঁকা থাকায় জানার ধারেই বসার জায়গা পেয়ে গেল
পূর্বী। জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ওকে বিদায় জানাতে জানাতে বলল- রাতে ফোন করো।
নভনীল একন ঠিক
বুঝতে পারল না ও কি পূর্বীর মন জয় করতে পেরেছে নাকি ব্যার্থ হয়েছে! মেয়েদের এই এক
সমস্যা কিছুতেই সোজা জিনিসটা সোজা ভাবে বলতে পারে না। আবার সেই রাত অবধি অপেক্ষা
রয়ে গেল।
২
সকাল বেলাতেই ভির বাস ও লোকের ঘাম, অনেক চিৎকার কিছু
ব্যক্তিগত কথা শুনতে শুনতে রোজই অফিস যেতে হয়। পূর্বী মাঝে মাঝেই ভাবে এভাবে আর
বাসে যাতায়াত করবে না, অটো ধরে চলে যাবে। কিন্তু পরেই মাথায় আসে তাকে টাকা জমাতে
হবে। অনেক টাকা। তার বয়সী অনেক বন্ধুই এখন মোটা টাকা রোজগার করে গুছিয়ে সংসার
করছে। দ্বিতীয় কারণটা নিয়ে কোন আস্বস্তি না থাকলেও কেন জানিনা প্রথম কারণটার কথা
ভেবে মাঝে মাঝেই ভীষন হতাশা হয়। যদি একটু বেশি রোজগার করতে পারত তাহলে বাবা-মাকে
একটু বেশি টাকা দেওয়া যেত। নিজের শখ আহ্লাদগুলো পূরণ করা যেত। সাত পাঁচ ভাবনার
মধ্যেই কন্ডাক্টর চেঁচাতে লাগল ‘লেক গার্ডেন্স। লেক গার্ডন্স। আশতে দাদা সামনে বাচ্ছা আছে। ও দিদি ভাড়াটা
করেছেন?’
পূর্বী ধীরে
ধীরে নেমে হাঁটতে লাগল। অফিস গিয়েই দেখল তার প্রজেক্টের দুই সহকর্মী ওর জন্য হাঁ
করে অপেক্ষা করে আছে। ওদেরকে আর বোধ হয় সহকর্মী বলা যায় না। ওর অনেক কথাই ইতিমধ্যে
জেনে গেছে ওরা। তবে এখনো জানে না ওর জীবনের চরমতম একটা কথা।
‘পূর্বীদি কাল কেমন কাটালে? কী করলে তোমরা? কোথায়
গেলে?’ অনিতা এক নিশ্বাসে সমস্ত প্রশ্ন গুলো করে ফেলল।
ঋষিতা বলল ‘ওরে পূর্বীদিকে আগে বসতে দে তবে তো
তবে তো জানতে চাইবি’।
কিছু বলার আগেই
সেখানে নবনিতা চলে। ওদের মুখে কিছু বোঝা না গেলেও পূর্বী বুঝল ওরা মনে মনে একটু
দমে গেল। নবনিতা সরাসরি পূর্বীকে প্রশ্ন করল কিরে তোকে যে বললাম জুডোর সাথে একটু
কথা বল, তুই কথা বলেছিস? সে তো তোর সাথে কথা বলার জন্য ছটফট করছে’। পূর্বীর মুখে এসে গিয়েছিল আমার আর কারোর সাথেই কথা বলার প্রয়োজন নেই। আমার
মনের মানুষকে আমি পেয়ে গেছি। বলতে গিয়েও নিজেকে সংযত করল। এখন ও সবাইকে জানানোর মত
সময় আসে নি। নিজেকেই জানানোর সময় হয়েছে কিনা তা বুঝতে পারছে না। লজ্জা লজ্জা মুখ
করে নবনিতা কে জবাব দিল ‘আচ্ছা ঠিক আছে বলব’।
নবনিতা চলে
যাওয়ার পরই ওদেরকে সব গল্প করল পূর্বী। ওরা দুজন এমন করে চোখ বড় বড় করে শুনছিল
দেখে বেশ কৌতূক অনুভব করছিল। এমন সময় ওদের একটা কাজে বাইরে যেতে হবে বলে জানানো।
তিনজনে তৈরি হয়ে বেড়িয়ে পড়ল।
সারাদিনের কাজ
শেষে ফেরার পথে তারা একটা ট্যাক্সি নিল। ট্যাক্সিটা চলার সময় অনেক গল্প করছিল ওরা।
হঠাৎ করে পূর্বী অনুভব করল গাড়িটা নতুন ব্রিজের পথ না নিল। বুকের ভেতর কেমন একটা
মোচর দিয়ে উঠল পূর্বীর। আজও পূর্বীর এই ব্রিজটার নাম মনে থাকে না, অর্নব ওকে
শিখিয়েছিল এটাকে তুই নতুন ব্রিজ বলবি। কতদিন হয়ে গেল অর্নবের সাথে তার কোন যগ নেই তাও
কেন স্মৃতির অতলে রয়ে গেছে ওই নামটাই! মানুষ বড় বিচিত্র জীব। যাকে ভুলতে চায় সে
কেবল স্মৃতির দোরগোড়ায় এসে কড়া নাড়ে। কেন?
দেখতে দেখতে
ট্যাক্সিটা সর্টকাট নেওয়ার জন্য একটা গলি পথ ধরল। পূর্বী ওদের দুজনকে বলল দেখো তো
এই বাড়িটায় কাউকে লক্ষ করছ নাকি। ওর কথায় ওরা দুজন অবাক হয়ে পূর্বীর মুখের দিকে
তাকাল। একটা বাড়িতে কেউ আছে কিনা তা বাইরে থেকে কীভাবে বোঝা সম্ভব। ওরা দুজন
পূর্বীর কথা শুনে হাসাহাসি করলেও পূর্বী আর পারছিল না। বুকের ভেতর একশটা হাতুড়ি ঘা
মারছিল। খালি মনে হচ্ছিল এখুনি যদি কেউ এই বাড়ি থেকে বেড়িয়ে আসে। প্রমাণ করে দেয়
সকলে যা বলছে তা মিথ্যে! আর ভাবতে পারছিল না পূর্বী। ভীষণ একটা কষ্ট বুকের মধ্যে
চেপে নিয়ে গুম হয়ে বসে রইল। অফিসে ফিরে গিয়েও বেশি বাক্যালাপ হল না। নভনীল ফোন করে
দেখা করার আবদার জানালেও পূর্বীর অসহ্য লাগল। ঠিক মত করে কথাও বলল না ওর সাথে।
বাড়ি ফিরেও
কিছু ভালো লাগল না। নিজের ঘরে দরজা দিয়ে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল। চোখের সামনে পুরোনো
দিন গুলো ফিরে ফিরে আসতে লাগল চোখের সামনে।
রাস্তার দিকের
জানালার পর্দাটা প্রথম দিকে খোলাই থাকত, সম্পর্কটা গভীর হওয়ার সাথে সাথেই আড়ালটা
বাড়তে লাগল। কাঠ ফাটা গরমে যখন তখন কেবল বাড়িতেই গল্প করত দুজন। একদিন হঠাত করে
ঠকুমা নীচের ঘরের আশেপাশে ছিল না। চকিতে পূর্বীর মুখটা নিজের দুহাতের চেটেয় হরে
অর্ণব নিজেকে মিশিয়ে দিয়েছিল পূর্বীর মধ্যে। তারপর বড়ই আদুরে গলায় পূর্বীর কাছে
অর্ণব জানতে চেয়েছিল যে ‘আমি ছোট বলে তোর মধ্যে কোন কমপ্লেক্স তৈরি হয় না তো’? পূর্বী বলল ‘আহা রে! যেন একেবারে দশ বছরের ছোট,
মোটে তো দুটো বছর ওতে এমন কিছু হয় না’।
আরো নিবিড় হয়ে
অর্ণব জানতে বলেছিল ধর আমি যদি চাকরি না করি, তেমন রোজগার না করি তাহলে পারবে
আমাকে নিয়ে থাকতে?
‘তোকে খাওয়াতে পারব না আমি অর্ণব? তোকে কোনো চিন্তা
করতে হবে না তুই কেবল আমার সাথে চিরটাকাল এই ভাবে থাকিস’।
দিনের ছবিগুলো
দ্রুত বদলে যেতে লাগল। অর্ণব একটার পর
একটা চাকরি করছে। আর করেক মাস পরপরই চাকতি ইস্তফা দিচ্ছে। কারণ কোনো না কোন ভাবে
ওর সম্মানহানি হচ্ছে। একবার দুবার এমন করতে করতে পাঁচ বারের বার বিরিক্ত হয়ে উঠল
পূর্বী। দিনের পর দিন তিক্তিতা কেবল বেড়ে যাচ্ছে। তবুও অর্ণবকে ছেড়ে থাকার কথা কোন
ভাবেই ভাবতে পারছে না পূর্বী। বাড়ির লোকেরা পূর্বীর উপর বীতশ্রদ্ধ, পূর্বী চাকরি
করলেও বাড়িতে কোন টাকা পয়সা দেয় না। সময় মত বাড়ি ফিরিতে পারে না। আস্তে আস্তে
পরিবারের সকলে কেমন যেন দূরের মানুষ হয়ে যাচ্ছে। সবসময় মায়ের অভিযোগ পূর্বীকে
নিয়ে। আর সহ্য করতে পারছে না পূর্বী। নানা টানা পোড়েনে যখন ব্যস্ত পূর্বী তকন
হঠাৎই একবার কাজের সূত্রে সুযোগ এল ঝাড়খন্ড যাওয়ার। পূর্বী ভাবল এবার কিছু দিনের
জন্য বাড়ি থেকে অর্ণবের থেকে দূরে থাকতে পারবে, অর্ণব বুঝতে পারবে নিজের ভুল গুলো।
অর্ণবকে কথাটা জানাতেই শুরু হল তুমুল অশান্তি। অর্ণব কোন অবস্থাতেই যেতে দিতে চায়
না পূর্বীকে। বারে বারে সন্দেহের কাঁটা বিঁধিয়ে বিশাক্ত করে তোলে পূর্বীকে। তার
কাছ থেকে জানতে চায় অন্য কোন ছেলের সঙ্গে পূর্বীর কোন সম্পর্ক হয়েছে কিনা। সময়
সুযোগ পেলেই অফিসের বিভিন্ন লোকের নামের সাথে পূর্বীর নামটা জড়িয়ে নোংরা ইঙ্গিত
করে। রাগ দুঃখ অভিমান ছেয়ে ফেলে পূর্বীর জীবনকে। অর্ণবের সমস্ত নিষেধকে অগ্রাহ্য
করে পূর্বী চলে গেল ঝাড়খন্ড।
এর আগেও পূর্বী
অর্ণবের সন্দেহ প্রবণ মন ও আচরণ দেখেছে কিন্তু সেটা যে এমন আকার ধারন করতে পারে সে
সম্পর্কে কোন ধারণাই পূর্বীর ছিল না।
একদিন
ঝাড়খন্ডের ফিল্ড ওয়ার্ক থেকে ফিরে পূর্বী শুনল তার জন্য কী এসে অপেক্ষা করছে গেস্ট
রুমে। তার আগে সে প্রচন্ড অভদ্র ব্যবহার করে হোটেলের রেজিস্টার দেখতে চেয়েছে। না
দেখাতে চাওয়ায় অস্রাব্য ভাষায় কথা বলেছে ও এমন আচরণ করেছে যে তারা বাধ্য হয়েছে
রেজিস্টার দেখাতে।
পূর্বী বুঝে
উঠতে পারছিল না কেন অর্ণব এমন অদ্ভুত আচরণ করছে। রাগে অপমানে পূর্বীর আর অর্ণবের
মুখ দেখতে ইচ্ছা করছিল না। কিন্তু উপায় নেই। হোটেলের অপেক্ষা করার স্থানটার
নিস্তব্ধতা নিমেষে চুরমার হয়ে যাচ্ছে অর্ণবের চিৎকারে। সময় শেষের আগেই ফিরে আসতে
হল পূর্বীকে। তবুও সব অপমান মুখ বুজে সহ্য করেছিল পূর্বী। প্রতিবাদ করেছে,
বুঝিয়েছে, ঝগড়া করেছে কিন্তু কখনই অর্ণবকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবতে পারে নি পূর্বী।
আবার যেতে
হয়েছিল একটা কাজে সুন্দরবন। বাড়ি ফিরিতে রাত হবে একথা বাড়িতে জানিয়ে গিয়েছিল।
অর্ণবকেও বলেছিল ফিরতে রাত হবে। সেই দিন বাড়ি ঢোকার মুখেই দেখা হল অর্ণবের সঙ্গে।
বাড়িতে তখন মোটামুটি তাদের বিয়ের কথাবার্তা পাকা। আর দুমাস পরেই বিয়ে। তাই মোড়ের
মাথায় অর্ণবকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে প্রথমেই খটকা লেগেছিল। পূর্বীকে দেখার সাথে
সাথেই অর্ণবের মাথায় যেন রোখ চেপে গিয়েছিল সেদিন। হঠাৎ রাস্তার মাঝেই চেঁচাতে শুরু
করে তার উপর। চেঁচাতে চেঁচাতে হঠাৎ
মাত্রাছাড়া কথাবার্তা বলা শুরু করে। পাড়ার লোকেরা দেখতে থাকে, পূর্বীর ভাই
এসে কোন মতে পূর্বীকে অর্ণবের রোষের হাত থেকে বাঁচিয়ে নিয়ে যায়। আর পারে না পূর্বী
সহ্য করতে। বাঁধ ভেঙে যায় সমস্ত ধৈর্য্যের। বহুদিনের জমে থাকা অসন্তোষের আগুনে
লাভার মত ফুটতে থাকে পূর্বী। তারপর পনেরো দিন সমস্ত কিছু থেকে গুটিয়ে নিয়ে নিজের
মনের গহীনে ডুব দেয় সে। নিজেকে বড় ছোট মনে হতে থাকে তার। সিন্ধান্ত নিতে আর দেরী
করেনি পূর্বী। সেদিনই ফোন করে অর্ণবকে জানিয়ে দেয় তার সাথে দেখা না করতে। অর্ণব
কিছুদিন পর পূর্বীর সাথে দেখা করে জানিয়েছিল পূর্বীকে ছাড়া কোন ভাবেই সে বাঁচতে
পারবে না। মিথ্যে মিথ্যে বলেছিল সেদিন। কিছুদিন আগেই পৌলমী পূর্বীকে খবর দিয়েছে
অর্ণব কিছু মাস মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে থেকে দিব্যি একটি মেয়ের সাথে প্রেম করে
বেড়াচ্ছে। জীবন কারোর জন্য থেমে থাকে না। থেকে যায় কেবল এক শূন্যতা ও অসংখ্য
স্মৃতি। মনের ভেতরে থাকা আর এক মন কখন যেন সেই স্মৃতির ঝাঁপি খুলে দেয়, বুদবুদের
মত বেড়িয়ে আসে রঙবেরঙের মূহুর্ত।
অনেক্ষণ ধরে
ফোনটা বেজেই চলেছে। ফোনের শব্দে পুরোনো ছবিগুলো খান খান হয়ে ছিঁড়ে যাছে। নভনীলের নামটা ফোন
ভেসে আছে। কেন কেন এত ফোন করে নভনীল। এসব তো অর্ণব ও করত। তারপর তো সব একদিন মিলিয়ে
গেল। এমন করে তো নভনীল ও একদিন চলে যেতে পারে! সব মিথ্যে, সব ফাঁকি হয়ে রয়ে যেতে
পারে। ফোনটা বেজে বেজে এক সময় নিজের ডাক বন্ধ করল। পূর্বী দেখল ২২ টা মিস্ কল!
পূর্বীর মনে হল এবার সে বড্ড বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে। জীবনের ক্ষেত্রে তার
নিজস্ব কিছু নীতি আছে, সেই নীতি বোধ সে কখনই বিসর্জন দিতে পারে না। নভনীলের সাথে
সম্পর্কে জড়ানোর আগেই পূর্বী স্থির করে নিয়েছিল কখনই নভনীলের সাথে অর্ণবের তুলনা
করবে না। কিন্তু বাস্তবে টুসি বারবারই সেই কাজটা করে ফেলে। আবার ফোনটা বাজছে। না
অন্য কারোর ভুলের সাজা অন্য কাউকে দেওয়া যায় না। তা করা উচিত নয়। চোখের জল মুছে
পূর্বী ফোনটা ধরল।
৩
লেকের ধারটায়
সন্ধ্যের দিকে হাঁটতে বেশ ভালোই লাগে। পরন্ত বিকেলে সূর্যের আলো গায়ে মেখে এগিয়ে
চলেছে পূর্বী আর নভনীল। জানিস পূর্বী তুই সেদিন যখন আমার ফোনটা তুলছিলি না তখন মনে
হচ্ছিল তুই বোধহয় আমার সাথে আর সম্পর্ক রাখতে চাইছিস না।
‘দূর পাগল তা কেন হবে?’ ওদের সম্পর্কটা কবে যে তুমির
গন্ডি পেড়িয়ে তুই হয়ে গেছে তা পূর্বী বুঝতেও পারে নি। তুমির থেকে তুই ডাকটাই বেশি
আপন বলে মনে হয় দুজনেরই।
তুই কী এখনো
বুঝিসনা যে তোর থেকে কোন সাড়া না পেলে আমার কেমন অসহায় মনে হয় নিজেকে। আর তার আগের
দিনই আমি তোকে আমার পুরোনো সম্পর্কটা নিয়ে বলেছি। তাই আমার মনে হয়েছিল আমার পুরোনো
সম্পর্কটা ভেঙ্গে যাওয়ার জন্য তুই আমার ব্যর্থতাকে দায়ি করে আর এগোতে চাইছিস না।
কথাটা বলার সময় নভনীলের গলার আবেগ ও অভিমান পূর্বীকে স্পর্শ করে গেল। সূর্যের
অস্তিমিত আলোয় ঝলমল করছিল নভনীলের মুখ। সে মুখ দেখলেই মনে হয় সারা জীবন এমন ভাবেই
ভালোবাসতে পারবে মানুষটা। ধীরে ধীরে পূর্বী নভর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় ধরে।
হাতে আলতো চাপ দিয়ে বুঝিয়ে দিতে চায় সারা জীবন আমি তোর সাথেই আছি।
কৃষ্ণচূড়ায়
রাঙা রাস্তা, বিকেলের পড়ন্ত আলোকে সঙ্গে করে এগিয়ে চলে ওরা। সমস্ত অতীতকে মুছে
দিয়ে যায় আগামী...
No comments:
Post a Comment